একজন ঝাড়ুদার সমাচার

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। সেজন্যই কিনা সেদিন দেখলাম গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছেন চারদিক। খুবই ভালো!!! এমন একজন গূরুত্বপুর্ণ ব্যক্তি ঝাড়ু হাতে নিয়েছেন…মারহাবা মারহাবা…১০ জন নিয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে ঝাড়ু দিচ্ছেন…মারহাবা মারহাবা !!!

ভুলটা ভাংলো তখনি যখন ঝাড়ু দেয়া জায়গাটার নাম পড়লাম চট্টগ্রাম ডি সি হিল। কনফিউজড হয়ে গেলাম, কারণ তিনি তো তার নির্বাচনী আসন চট্টগ্রাম-১ (চট্টগ্রাম উত্তর জেলা) এ থাকার কথা, হঠাৎ কেন তার মহানগরে ঝাড়ুদার হিসেবে আবির্ভাব…??? নাকি এই ঝাড়ুদার মন্ত্রী মহদোয়ের মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাই? পরক্ষণেই ভুলটা একেবারে ভেঙ্গে দিলেন মন্ত্রী মহোদয়, রেডিসন ব্লু’র মেজবান হলে ‘চট্টগ্রামের কৌশলগত নগর পরিবহনের মহাপরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি সরাসরি জাতিসংঘ পার্কের মালিকানা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের দিকে আঙ্গুল তুললেন।

জবাব মিলতে দেরী হয় নি, মন্ত্রীর পাল্টা জবাবে প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী বলেন,

‘কিছুদিন আগে মিউনিসিপ্যাল স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতে হকার দেখে আমার কাঁধে হাত রেখে মোশাররফ সাহেব বলেছিলেন, “এগুলো তোমরা দেখো না? তোমার মেয়র চোখে দেখে না?” আমি বলেছি, অপেক্ষা করুন। আমরা দেখব। কিন্তু আজকে কি উনি (মন্ত্রী মোশাররফ) রিয়াজউদিন বাজারের দিকে যাননি? নিউ মার্কেটের ফুটপাত দেখেননি?’
হাসনী মন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা আসলে উনার (মন্ত্রী) পলিটিক্যাল শিকার। উনি (মন্ত্রী) একটি পার্ট (পক্ষ) নিয়ে ফেলেছেন। এ জন্য আমাদের সঙ্গে একটু সমস্যা হচ্ছে।’
পাঁচলাইশে পার্ক নির্মাণ প্রসঙ্গে হাসনী বলেন, ‘মনজুর (সাবেক মেয়র মনজুর আলম) সাহেবের আমলে উনি মন্ত্রী ছিলেন না? মনজুর আমলে যখন আমরা (সিটি করপোরেশন) সুইমিংপুল করছিলাম, তখন উনি (মন্ত্রী) কেন বাধা দিতে পারেননি? আমরা তো তখন উন্নয়নের জন্য টেন্ডার করেছিলাম। উনিও মন্ত্রী ছিলেন।’

প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মন্ত্রী মহোদয়কে নিয়ে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা;

জনপ্রিয় ছাত্রনেতা সজীব রিদওয়ানুল কবির লিখেন

উনি যেহেতু নিজ এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে এসে ফ্রীতে ঝাড়ু দেন….তাইলে আমি আর টাকা দিয়া কাজের বুয়া রাখুম ক্যারে…!!!???

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসিন আরাফাত বাপ্পী লিখেন,

ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের কথা ভুলে গেছেন..?
সেদিন আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ভাইয়ের দয়াতে মাইর খাওয়ার হাত থেকে বাঁচেছেন। সম্মান নিয়ে সেখান থেকে বের হওয়ার রাস্তাও করে দিয়েছিলেন নাছির ভাই। আর আজকে আপনি সেই আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ভাইয়ের দিকে আঙ্গুল তোলেন!
সম্মান দিতে শিখেন তাহলে নিজেও সম্মানিত হবেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর-১ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তাঁর সুদীর্ঘ, সফল ও সমৃদ্ধ রাজনৈতিক জীবনে সফলতা পেয়েছেন প্রচুর। রাজনীতিতে তার অবদান অস্বীকার করবে এমন মানুষ খুব সম্ভবত নেই। কিন্তু হঠাত করেই এমন একজন ব্যাক্তি আমুল বদলে গেলেন। গত বছরের এপ্রিলে তিনি বহদ্দারহাট ও কদমতলি উড়ালসড়কের উপযোগিতার প্রশ্ন তুলে তৎকালীন সময়ে যারা এমপি, মন্ত্রী ছিলেন তাদের দিকে আঙ্গুল তুললেন। সত্যি বলতে কি, বহদ্দারহাট ও কদমতলি উড়ালসড়কের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন সাধারণ জনগণই তুলে, এবং কিভাবে সিডিএ’র এই মুল্যহীন প্রকল্পগুলো একনেকে পাস হয় তা আজো সাধারণ জনগণের বোধগম্য নয়। তাই, এই জায়গায় মন্ত্রী জনগণের সাথে সহমত প্রদর্শন করে হয়তো বাহবা কুড়াতে পারতেন কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধে তখনি যখন এর দায় তিনি সরাসরি তুলে দেন তখনকার মন্ত্রী, এমপিদের উপর, তিনি বলেন, “যখন বহদ্দারহাট, কদমতলী ও মুরাদপুর উড়ালসড়ক হচ্ছে তখন আমি মন্ত্রী থাকলে হয়তো অনুৎসাহিত করতাম।” ভাবখানা এমন যেন তিনি তখন মন্ত্রী ছিলেন না। স্পষ্টতই তিনি তখন দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর সেই সময় উপস্থিত থাকা সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ ডঃ আফসারুল আমীনের সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হন যার সমাপ্তি ঘটে ছোট বাচ্চাদের মত হাতাহাতির মাধ্যমে। তখন বর্তমান চসিক মেয়র আলহাজ্ব আ জ ম নাছির উদ্দিন’ই তাদের নিবৃত্ত করেন এবং মন্ত্রী মহোদয় বের হওয়ার সময় বাধার মুখোমুখি হওয়ার দরুন, তাঁকে নিরাপদে ও সসম্মানে গাড়িতে তুলে দেন।

কি যেন হয়ে গেল এই এক বছরের মধ্যে। সিডিএ’র কর্মকাণ্ড ধুয়ে দেওয়া সেই ব্যাক্তিটি এক বছর পর এসে সেই সিডিএ’র গান গাওয়া শুরু করলেন। সেদিন যিনি সাহায্য করা চসিক মেয়র আলহাজ্ব আ জ ম নাছির উদ্দিন ও চসিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুললেন। আরো তুললেন এমন বিষয়ে যেখানে আসলে তাঁকে জবাব দেওয়ার সাধারণ জনগনই যথেষ্ট। কারণ জনগণ দেখেছে কিভাবে বিলবোর্ডের জঞ্জালে পরিনিত হওয়া নগরী বিলবোর্ড মুক্ত হয়েছে। নগরবাসী উপলদ্ধি করেছে, অন্যান্য সময় যখন কোরবানির বর্জ্য দিনের পর দিন থাকতো, দুর্গন্ধ ছড়াতো তখন কোরবানির দিন সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করে নগরীকে চকচক করে দেওয়ার রেকর্ড কতটা মুল্যবান। অনেকেই মারামারি, কাটাকাটি করেও যা পারেন নি; যুগের পর জুগ হকারদের দখলে থাকা, তামাকুমুন্ডি লেন, হকারস মার্কেট, মিউনিসিপ্যাল্টি স্কুল সহ নিউ মার্কেট এরিয়া শান্তিপূর্ণ ভাবে হকার উচ্ছেদ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও হকারদের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার কাজ করে তাই দেখাতে পেরেছে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এর নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। শহরে আগে যেখানে ডাস্টবিন, ময়লার স্তুপ দেখা যেত তা এখন দেখা যায় না বরঞ্চ সেসব জায়গায় ফুলগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর এটি মূলত চসিকের নেয়া “ডোর টু ডোর” আবর্জনা অপসারণের সফল বাস্তবায়নের ফলাফল। 

পার্ক সংক্রান্ত বিষয়াদি বলতে গেলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র আলহাজ্ব আ জ ম নাছির উদ্দিন ভাইয়ের জবাবটাই যথার্থঃ

দৈনিক সুপ্রভাতে প্রকাশিত সংবাদ

পরিশেষে আগামী ১২ ই জানুয়ারি ৭৫ বছর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করতে যাওয়া বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন’কে চট্টগ্রাম শহরে আমরা ঝাড়ুদারের ভূমিকায় দেখেছি, অথচ তিনি এক বছর আগেই তিনি তারও যে দায় আছে তা অস্বীকার করেছিলেন ?! সুদূর চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে শহরে এসে ঝাড়ুদার হওয়ার অসংখ্য কারণের মধ্যে মূল একটি কারণ হতে পারে পরিবার তন্ত্রের চিন্তা। স্বাভাবিক ভাবেই আগামী জানুয়ারিতে ৭৫ পূর্ণ হতে যাওয়া বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ বিশ্রাম চাইতেই পারেন। আর তখন??

আসুন আমরা পূর্তমন্ত্রী পুত্রের অসংখ্য সংবাদের মধ্যে তাজা একটি সংবাদ দিয়ে শেষ করিঃ

প্রভাব খাটিয়ে রেলের জমিতে মন্ত্রিপুত্রের কারখানা!

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুমঘাট এলাকায় রেলওয়ের কাছ থেকে এক ব্যক্তির ইজারা নেওয়া জমিতে প্রভাব খাটিয়ে কারখানা গড়ে তুলেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের ছেলে মাহবুব উর রহমান। যেখানে কারখানাটি (সিমেন্ট-বালুর তৈরি ব্লক বা একধরনের ইট) স্থাপন করা হয়েছে, তা কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহারের জন্য ইজারা নেন ওই ব্যক্তি। জমি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে লাইসেন্স শব্দটি ব্যবহার করে রেলওয়ে।
ধুমঘাটে দুটি রেলসেতু (ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ) রয়েছে। সেতুর নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তা আমলে নিচ্ছেন না মন্ত্রিপুত্র। মিরসরাই গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের নির্বাচনী এলাকা।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ধুমঘাট এলাকায় রেলওয়ের জায়গায় তৈরি করা কারখানা। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর ছেলে অনুমতি না নিয়ে এই কারখানা গড়ে তুলেছেন। ছবি – প্রথম আলো

 

সুত্রঃ প্রথম আলো, মূল সংবাদ পড়তে ক্লিক করুন

 

 

সাংবাদিক সব কোথায়? আমরা ভোরবেলা ঝাড়ু দিবো তোমরা ভিডিও করবে। ইস ঝাড়ু দেওয়ার পুরো ভিডিওটা যদি থাকতো !!!