মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে গণহত্যাঃ লে. কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে গোপনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সৈন্য বোঝাই জাহাজ আনতে শুরু করে। পাকিস্তানি জাহাজ এমভি সোয়াত ১৭ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান নৌবাহিনীর ঘাঁটির কাছেই ১৭ নম্বর জেটির অবস্থান।
পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের খাদ্যবাহী জাহাজ ছিল সোয়াত এবং এর ধারণক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার টন। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন বাঙালি সামসুল আলম চৌধুরী। জাহাজের অভ্যন্তরে অস্ত্রশস্ত্রের উপরে কিছু চালের বস্তা রাখা হয়েছিল যেন কেউ বুঝতে না পারে যে এর নিচে অস্ত্র লুকানো আছে। জাহাজটি বন্দরে পৌঁছার পর ১৮ মার্চ অস্ত্র খালাসের অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানান তৎকালীন বন্দর ট্রাফিক ম্যানেজার গোলাম কিবরিয়া, এস এম মিয়া, জেটি সুপার মতিউর রহমান, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, সহকারী জেটি সুপার ননিগোপাল সেন। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা হয়, কিন্তু তারপরও বন্দরের কর্মকর্তারা অস্ত্র নামানোর অনুমতি প্রদানে রাজি হননি। ১৯ মার্চ নৌবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান ও সেখানে অবস্থানরত সামরিক কর্মকর্তারা অস্ত্র খালাসের চেষ্টা করে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের ডক ও বন্দর শ্রমিকরা অস্ত্র খালাসে প্রবল বাধা প্রদান করেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চারদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রাম বন্দর ও শহর থেকে শ্রমিক ও জনতা জেটি ঘেরাও করে রাখে। এভাবে জাহাজ থেকে বন্দরে অস্ত্র নামানো বন্ধ করা হয়।২৩ মার্চ চট্টগ্রাম শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলপূর্বক জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করে সেই অস্ত্র বাঙালি নিধনে ব্যবহার করবে। এই তথ্য প্রচার হওয়ার পর শহর ও বন্দর এলাকায় ব্যাপক প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। চট্টগ্রামের নেতা এম এ হান্নান, কাজী আবদুল ওহাব, এম আর সিদ্দিকী, এম এ মান্নান, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা, ডক ও বন্দর শ্রমিকরা সম্মিলিতভাবে আন্দোলন শুরু করেন।আরেকটি পাকিস্তানি জাহাজ এমভি ওশান এনডিওরেন্স প্রতি মাসে করাচি-চট্টগ্রাম রুটে ৬ বার প্যাসেঞ্জার ট্রিপ হিসেবে চলাচল করত। গোপনে সেই জাহাজেও পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সৈন্য, ৩ জন ক্যাপ্টেন পদবির অফিসার, ৬০টি রিকয়েললেস রাইফেল ও অন্যান্য হাতিয়ার বহন করে জাহাজটি ১৮ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের ৪ নম্বর জেটিতে ভিড়ে। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিল কামাল আব্বাস। শ্রমিকরা জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামাতে বাধা প্রদান করেন। সেই রাতে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈন্যরা নিজেদের অস্ত্রসহ জাহাজ থেকে নেমে সেনানিবাসের দিকে গমন করে, কিন্তু সেদিন তারা কোনো ভারী অস্ত্র নামাতে পারেনি। ৪ নম্বর জেটির অবস্থান ছিল শহরের দিকে ও জেটির চারদিকে জনতা ঘেরাও করে রেখেছিল। সুতরাং উপায়ন্তর না দেখে জাহাজটি ভারী অস্ত্রসহ ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে করাচির উদ্দেশে রওনা দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক চট্টগ্রাম দখল করার পর এই জাহাজটি ১১ এপ্রিল পুনরায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ফেরত আসে।বন্দরে অবস্থানরত ডক ও বন্দর শ্রমিকরা সোয়াত জাহাজ অস্ত্র খালাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে তাদের আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন- আবদুল নবী চৌধুরী (নবী মিস্ত্রি), আহসান উল্লাহ চৌধুরী, এ বি এম আবুল কালাম, নুরুল আবসার, এম এ সাত্তার, শেখ মানিক, অহিদুল আলম ফারুক, মঞ্জুর আলী, সুলতান আহমেদ ভুঁইয়া, আবদুল মান্নান সিকদার, নজরুল ইসলাম, ডক শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম ঠাণ্ডা মিয়া, শেখ দেলোয়ার, নুর মোহাম্মদ, সিদ্দিকুল ইসলাম, এস এ মজিদ, বাদশা মিয়া, আলী আকবর চেয়ারম্যান, এনামুল হক এনাম, জানে আলম, মো. হারুন, মফিজুর রহমান, মুসা আল নূরী, নুরুল আলম, ডা. এম এ হালিম, এজহার মিয়া বয়লার, কামাল উদ্দিন, প্রফেসর ফজলুল হক, ডা. আইয়ুব আলী, কাজী নুর মোহাম্মদ জুনু, শামসু, টুনু মাঝি, ছাত্রনেতা শামসুদ্দিন আহমেদ, মোশারফ হোসেন, শামসুল হক সফি, রফিক, কাজী হেলাল, বন্দর এলাকার বাসিন্দা ডা. রওশন আরা, নুরজাহান বারী, সালমা প্রমুখ।এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সামরিক কর্তৃপক্ষ ২০ বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের বন্দরে প্রেরণ করে তাদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করে। তাদের সঙ্গে কিছু বাঙালি সৈন্যকেও প্রেরণ করা হয়।১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলপূর্বক পাকিস্তানি জাহাজ এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস করতে শুরু করলে প্রচণ্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা অঘোষিতভাবে গুলি ছুড়তে শুরু করলে শ্রমিক ও জনতার মধ্যে তৎক্ষণাৎ ৮ জনের মৃত্যু হয়।২৪ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাগুলির প্রতিবাদে শ্রমিক ও কর্মচারীদের প্রতিরোধ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। তারা লাঠিসোটা দিয়ে ও গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। হাতিয়ার হিসেবে তাদের কাছে ছিল রড, লাঠিসোটা, ইটপাটকেল ইত্যাদি। সারারাত নিরস্ত্র বাঙালি শ্রমিক-জনতার সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে বহু বাঙালি শহীদ হন। শ্রমিকদের মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বর্বরোচিত এই ঘটনার কথা মনে হলে এই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো ভয়ে শিউরে ওঠেন। তাদের কাছ থেকে জানা যায় যে, এমভি সোয়াতের সামনে ২৩ জন শ্রমিককে ও চট্টগ্রাম বন্দরের ৩ নম্বর জেটিতে ৪০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানরত বাঙালি সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করে বন্দরে আটক করে রাখে এবং ২৭ মার্চ বিকেল ৪টার সময় আটক বাঙালিদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে নায়েব সুবেদার নুরুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে প্রাণে রক্ষা পান এবং পরবর্তীকালে এই গণহত্যার তথ্য তার সহকর্মীদের প্রদান করেন।মার্চ মাসে বন্দরের পাকিস্তানি জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অভিযোগে বন্দরের আশপাশের হালিশহর, পাহাড়তলি, আগ্রাবাদ এলাকার নিরীহ ও নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্মম গণহত্যা চালানো হয়।মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের শতাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায় যে, ১৬ নম্বর জেটিতে বহু মানুষের লাশ পড়ে ছিল। তা ছাড়া পতেঙ্গা বিমানবন্দরের কাছেও অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়। গবেষণার ভিত্তিতে ১০২ জন শহীদের নাম পাওয়া গেছে কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন যে, আরো অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল যাদের নাম আজো সম্পূর্ণরূপে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।লেখকঃ বীরপ্রতীক, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তসৌজন্যেঃ ভোরের কাগজ

, albd.org