এক কোটি তরুণকে শেখ হাসিনা বাঁচাবেনই

দেশের অন্যতম প্রাচীন দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদ অনুযায়ী দেশে ৭৭ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। বেশ কয়েক সমাজকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের মতে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। ছোট পরিসরে সারা দেশের যে সংবাদ পাই সে পরিসংখ্যান নিয়ে অঙ্ক করলে দেখা যায়, মাদক সেবনকারীর সংখ্যা এক কোটি বিশ লাখ হতে পারে। তাই সব মিলিয়ে বলা যায়, ৮০ থেকে ৯০ লাখ লোক ভয়াবহ রূপে মাদকাসক্ত। এই মাদকাসক্ত বলতে বিড়ি বা সিগারেট খায় বা নিয়মমাফিক ড্রিঙ্ক করেন এমন নয়। এরা মূলত অতিরিক্ত পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ইত্যাদি মাদক গ্রহণ করে। এ মূহূর্তে দেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ইয়াবা। আর তার ছোবলটি গিয়ে পড়েছে তরুণ সমাজের ওপর। অথচ এই তরুণ সমাজের দিকেই আমরা তাকিয়ে আছি। এই তরুণ সমাজের জন্যই দেশের যত অর্থনৈতিক কর্মকা-। কারণ, আজ দেশের যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে এর সুফল পাবে এই তরুণ সমাজ। অন্যদিকে এ তরুণ সমাজই বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতি বির্নিমাণের সৈনিক।

২০০৮ সালে এমনই এক কোটি তরুণ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। তারাই ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার অগ্রসৈনিক। তারা সকল ভাল-মন্দের সঙ্গে থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে শেখ হাসিনাকে যথেষ্ট সাহায্য করে যাচ্ছে। গত নয় বছরে তারা অনেক পথ পেরিয়ে এসেছে। দেশও এগিয়ে গেছে অনেক দূর। স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে দেশ। মানুষের মাথা পিছু আয় বেড়ে গত নয় বছরে ৬শ’ ডলার থেকে ১৬০০ ডলার হয়েছে। রফতানি বেড়ে আজ ৩৩ পার্সেন্ট। আমদানি ১৪ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের। আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতি সাধারণ গতিতে চললেও এর আকার দ্বিগুণ হবে। দেশের অর্থনীতি যখন এভাবে এগিয়ে চলছে, এই সময়ে দেশের এক কোটির মতো তরুণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু এক কোটি পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ নয়, গোটা অর্থনীতির জন্যও একটা দুঃসংবাদ।

দুই হাজার ১২ সালে জাপানের অর্থমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জাপান কেন এ মূহূর্তে বাংলাদেশে বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী? তিনি প্রথম কারণ হিসেবে বলেছিলেন, বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তির জন্য। কারণ, জাপানের প্রয়োজনীয় তরুণ শ্রমশক্তি নেই। বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে এই তরুণ শ্রমশক্তি প্রায় ৫ কোটি হবে। তাই তারা এখানে আরও অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে চায়। আর সেই পাঁচ কোটি তরুণের এক কোটি তরুণকে যদি এভাবে নষ্ট করে দেয়া হয়, তাদের যদি মাদকে আসক্ত করে ধ্বংস করে দেয়া হয়, তা হলে সেটা দেশের কত বড় ক্ষতি, তা কি ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন রাখে? এই এক কোটি তরুণকে কারা ধ্বংস করছে? সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে, এই কোটি তরুণকে মাদকাসক্ত করে ধ্বংস করছে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। যদি এর পেছনে কেউ না থাকে, শুধু ব্যবসায়ীরা এ কাজ করে, তা হলে ধরে নিতে হবে এরা শুধু নীতিহীন ব্যবসায়ী নয়, এরা দেশের জন্য চরম ক্ষতিকারক এক গোষ্ঠী। মূলত এরা এক কোটি লোককে হত্যা করছে। এরা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক বিনির্মাণকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তাই এখানে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, এদের বিরুদ্ধে কেবল সেটাই প্রযোজ্য, ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। প্রধানমন্ত্রীর কথার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ নয়, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতেও এই যুদ্ধ। বিষয়টি ভয়াবহ আকার নিয়েছে, দুর্বৃত্তের হাতে পড়েছে বলেই এর বিরুদ্ধে প্রথমেই কঠোরতা ছাড়া কোন পথ নেই। কঠোরতা দিয়ে অবৈধ ব্যবসায়ী, চোরাচালানি এদের ধ্বংস করার পরে যেতে হবে দ্বিতীয় ধাপে। যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপÑ উৎসমূল সিলগালা করা। কারণ, এই চোরাকারবারি ও অবৈধ ব্যবসায়ীদের বন্ধ করতে পারলে তখন উৎসমূলে যাওয়ার লোকও কমে যাবে। তখনই সম্ভব হবে উৎসমূল বন্ধ করা। তাছাড়া আমাদের দেশে মাদক প্রবেশের অন্যতম একটি উৎস পথ মিয়ানমার। সত্যি অর্থে মিয়ানমার একটি ভাল দেশ নয়। দীর্ঘ সামরিক শাসনের কবলে থেকে শুধু জটিল একটি দেশই হয়নি, দুর্বৃত্ত নিয়ন্ত্রিত একটি দেশ হয়েছে। তাই আমাদের দেশের অবৈধ ব্যবসায়ীদের নির্মূল না করে ওই উৎস বন্ধ করা খুবই কষ্টকর। এর পরের যুদ্ধ দেশের মাদকসেবীদের সুস্থ করে তোলা।

পাশাপাশি এর পেছনে কোন চক্রান্ত আছে কিনা সেটাও ভাবতে হবে। আমাদের দেশের ভেতর একটি শ্রেণী কখনই চায় না দেশ এগিয়ে যাক, দেশ উন্নত হোক। অন্যদিকে তাদের পেছনে আছে ১৯৭১ সালের পরাজিত আরেকটি শক্তি। এসব মিলে তারা দেশের উন্নয়ন ঠেকাতে দেশের মানুষের ভেতর মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে কিনা, তাও ভেবে দেখার দরকার আছে। কারণ, আমরা ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই। বঙ্গবন্ধু দেশে সব ধরনের জুয়া বন্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়ে তরুণ সমাজের চরিত্র নষ্ট করার জন্য সারা দেশে হাউজি খেলা ও লাকি খানের উদ্দাম নৃত্য শুরু করে। যার ভেতর দিয়ে ওই কালো চশমা পরা, হোন্ডা নিয়ে ঘোরা গু-া শ্রেণীর যুবদল এ দেশে তৈরি হয়। বলা যেতে পারে বাংলাদেশে এর আগে এমন নৈতিকতাহীন কোন যুব সংগঠন গড়ে ওঠেনি। আজও যখনই অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে তখন রিজভী বক্তব্য দিয়েছে- বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। তাই এই মাদক ছড়িয়ে দেয়ার মূল উদ্দেশ্য জিয়াউর রহমানের হাউজি ও লাকি খানের মতো কিনা, সেটাও ভেবে দেখা দরকার।

অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার পরে মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। যারা প্রতিবাদ করছেন, তারা কেউ কি ওই এক কোটি পরিবারের কোন একটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন? যাদের ঘরে একজন মাদকাসক্ত আছে, তাদের সঙ্গে একবার কথা বলে তারা এই বিবৃতিগুলো দিলে আরও ভাল হতো। তা হলে তারা বুঝতে পারতেন তারা কাদের পক্ষ হয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন! মানবাধিকারকর্মীরা এখন বলতে পারেন, বিবৃতি তো দেশের কয়েক সম্মানিত নাগরিকও দিয়েছেন! তারাও প্রশ্ন তুলেছেন এই অভিযানে নিহতদের নিয়ে। দেশের সম্মানিত নাগরিকদের ভেতর সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষকসহ আমার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ও কয়েক ঘনিষ্ঠ বন্ধুও রয়েছেন। দেশের যে কোন নাগরিক তার মত প্রকাশ করতে পারেন। তাই সেই অধিকারে ওই বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে আমার মত হলো, তাঁরা মনে হয় সঠিকভাবে দেশের এই এক কোটি মাদকাসক্ত সম্পর্কে অবহিত নন। তাছাড়া, তারা সরকারের যে পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেই পদ্ধতিতেই সরকার জঙ্গী দমন করেছে। এ কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে শুরু থেকেই জামায়াত-বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করে। তাদের লক্ষ্য অতি সহজ। তারা যদি কোনভাবে মাদকের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানের পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে তা হলেই তারা তাদের দ্বিতীয় ধাপের কাজটি শুরু করে দেবে। অর্থাৎ তারা তখন বলবে, জঙ্গী দমন পদ্ধতিও ভুল ছিল। আর সেটা নিয়ে এগুতে পারলেই এক পর্যায়ে গিয়ে বলবে, যাদের জঙ্গী বলে হত্যা করা হয়েছে তারা ভাল মানুষ ছিল। তাই আমার মনে হয়, মাদকবিরোধী এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ পক্ষান্তরে ওদের চক্রান্তে পা দিয়ে ফেলেছেন। তাদের পা সেখান থেকে বের করে আনার জন্য তারা নিজেরা যথেষ্ট শক্তিশালী এবং এক কোটি মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীর কথা ভেবে তারা তাদের এই পা বের করে আনবেনই। তা না হলে অনেক সময় যেমন সুলতানা কামালের কথা বদিউল আলম মজুমদারের হাত শক্তিশালী করে, এ বিবৃতিও তেমনি রিজভীর হাতকে শক্তিশালী করবে।

বাস্তবতা হলো, রিজভী যদিও দাবি করেছেন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মারা হচ্ছে, তারপরেও মৃতদের ভেতর থেকে একজন সৎ মানুষকে তারা বের করতে পারেনি। অন্যদিকে নয় বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পরে একরামের মতো একজন সৎ-নিলোর্ভ কর্মী আওয়ামী লীগের টেকনাফে যখন আছে তখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত এমন অনেক একরাম আছে। এখানেই শেখ হাসিনার শক্তি, এখানেই স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি, এখানেই আওয়ামী লীগের শক্তি। আর এই শক্তিতে ভর করেই শেখ হাসিনা এত দৃঢ় গলায় বলতে পারেন, আমি যা ধরি তা শক্ত করেই ধরি। তাই আশা করা যায়, বিভ্রান্তি যে পর্যায় থেকেই আসুক না কেন, এক কোটি তরুণকে শেখ হাসিনা বাঁচাবেনই।