ফ্রিল্যাংসিংয়ের আদ্যোপান্ত নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু ভাবনা

ফ্রিল্যান্সিং কি? কাকে ফ্রিল্যান্সার বলা হয়? এমন অনেক প্রশ্নই যা অনেকেরই জানা কিংবা অনেকেরই অজানা।

ফ্রিল্যান্সিং না হোক, আউটসোর্সিং শব্দটির সাথে সবাই পরিচিত। মোড়ে মোড়ে, রিক্সার পেছনে, বাসের সিটে, চায়ের দোকানে রংচঙে, মসলা মাখানো বিজ্ঞাপন চোখে পড়েনি এমন সম্ভবত কেউ নেই। “ঘরে বসে বড়লোক হউন”; “আউটসোর্সিং শিখানো হয়”; “আউটসোর্সিং শিখে ঘরে বসে আয় করুন”; “গ্যারান্টি সহকারে আউটসোর্সিং শিখানো হয়” ইত্যাদি ইত্যাদি।

আউটসোর্সিং এর সবচেয়ে ভূল ব্যাখ্যা সম্ভবত একমাত্র শুধু বাংলাদেশেই হয়। ধরুন কোন প্রতিষ্ঠান অথবা কোন ব্যাক্তি একটি কাজ রিজেনেবল প্রাইসে অথবা ভালো কোয়ালিটির/ ভ্যারিয়েশেনের আশায় বাহিরে কারো মাধ্যমে অথবা কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করিয়ে নিলো। এক্ষেত্রে যিনি কাজটা দিচ্ছেন তিনি কাজটা আউটসোর্স করছেন।

এই আউটসোর্সিং কনসেপ্ট শুধু অনলাইন না অফলাইনেও বহু আগে থেকেই প্রচলিত। ধরুন, কোন প্রতিষ্ঠান একটি প্রকল্পের জন্য টেন্ডার আহবান করলেন কিছু শর্ত এবং রিকোয়ারমেন্ট দিয়ে। সেখানে অনেকেই প্রকল্পটির জন্য বিড করলেন। তখন প্রতিষ্ঠানটি, তার নির্ধারিত শর্ত ও রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী প্রকল্পটি দিয়ে দিলেন। এর মানেই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি তার একটা কাজ আউটসোর্স করলো। মোট কথা, যখন কোন ব্যাক্তি/কোন প্রতিষ্ঠান কোন কাজ অপর কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করান তখনি তাকে আউটসোর্সিং বলে। এখন বলুন, এখানে আপনি কি শিখবেন?

তাহলে বিজ্ঞাপনে যে বলে, “আউটসোর্সিং শিখুন” সেটা কি?

মহামূল্যবান একটি প্রশ্ন !! 

 

এবার আসুন দেখি ফ্রিল্যান্সিং কি? ফ্রিল্যান্স/ফ্রিল্যান্সিং/ফ্রি ল্যান্সার শব্দগুলো এক্টূ ভালো করে লক্ষ্য করুন; “FREE”LANCE/”FREE”LANCING/” FREE”LANCER প্রতিটি শব্দেই FREE, মানে স্বাধীন/স্বাধীনতা ; হ্যাঁ ফ্রিল্যান্সার মানেই স্বাধীন চেতা একজন পেশাজীবী যার কাজ করার নিজস্ব স্বাধীনতা আছে, কোন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ নয় । তিনি তার ইচ্ছেমত যতজন খুশি ব্যাক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের সাথে একইসময়ে কাজ করতে পারেন।

একজন অনলাইন ফ্রিল্যান্সার কার্যত ভাবে পুরোপুরি স্বাধীন। যখন, যেখানে ,যেভাবে খুশি কাজ করার স্বাধীনতা তিনি পান, শুধু মাত্র একটি ল্যাপটপ এবং ইন্টারনেট থাকলেই হলো !! বর্তমানে বাংলাদেশে ৬ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং পেশার সাথে জড়িত।

তাই বলা যায়, গতানুগতিক চাকরির বাইরে নিজের ইচ্ছেমত কাজ করার নামই ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশা। আর এই পেশায় যিনি জড়িত থাকেন তাকে ফ্রিল্যান্সার বলা হয়। একজন ফ্রিল্যান্সার কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবি হিসেবে নয়, কাজের ধরণ বা প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী স্বল্পকালীন কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে তাকে কিছু শর্ত মেনে চলতে হয়। তিনি চুক্তিভিত্তিক পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন, যা সময় অথবা নিদ্দিষ্ট পরিমানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা থাকে। মূলত বিভিন্ন অনলাইন মার্কেট প্লেস বা ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপি ফ্রিল্যান্সিং কাজ দেওয়া নেওয়া হয়।  অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সিং হলো স্বাধীনভাবে তথা দেশ বিদেশের কাজ করা ও অর্থ উপার্জন করা।

“ঘরে বসে আয় করুন” কথাটি কেন ফ্রিল্যান্সিং-এ বেশি ব্যবহারিত হয়? যেহেতু, শুধুমাত্র একটি ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই একজন ফ্রিল্যান্সার তার ইচ্ছেমত অবস্থান থেকে কাজ করতে পারেন, তাই অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সারই কোন বাড়তি খরচ না করে ঘরে বসেই কাজ করেন আর এভাবেই “ঘরে বসে আয় করুন” কথাটির উৎপত্তি।

কেন সবাই ফ্রিল্যান্সিং এর প্রতি আগ্রহী?

এটার কারণটা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেকে প্রথাগত নয়টা-পাঁচটা চাকরিতে আগ্রহী নয়, তার জন্য হয়ত কাজের সময়ের নমনীয়তার জন্যই ফ্রিল্যান্সিং সবচেয়ে আকর্ষনীয়। আবার অনেকে অফিসে চাকরির ক্ষেত্রে যত টাকা আয় করেন ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় করেন তারচেয়ে পাঁচ থেকে ছয়গুন বেশি। এমন অনেকেই রয়েছেন যারা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করেন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা, অথচ কর্পোরেট চাকরি করলে হয়ত তাদের বেতন হত ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০/৬০ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে হয়ত উনি বেশি টাকার জন্যই ফ্রিল্যান্সিং করেন এটিই তাঁর কাছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক। আর তাছাড়া কাজ করার স্বাধীনতার ব্যাপারটাতো আছেই !!

সাধারণত কি কি কাজ করা যায়?

অনেকে মনে করে থাকেন ফ্রিল্যান্সিং কেবল নেটওয়ার্কিং, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডিজাইন – ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও এনিমেশনের মতো কাজগুলোতেই সীমাবদ্ধ। আসলে কিন্তু তা নয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেসব কাজ করা সম্ভব তার সবই করতে পারেন একজন ফ্রিল্যান্সার। তবে এটা ঠিক আপনি যদি অনেক বেশি আয় করতে চান সেক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলোতেই সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একজন একজন শিক্ষার্থী চাইলে কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিকাশ করে কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেও ভালো মানের আয় করতে পারেন। অনলাইন মার্কেট প্লেসে বিভিন্ন ধরনের কাজ থাকে। একজন ফ্রিল্যান্সার তার দক্ষতা অনুযায়ি যেকোন কাজ করতে পারেন। যেমন- ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিজাইন, সফটওয়্যার/অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, ব্লগ রাইটিং/আর্টিকেল রাইটিং, ডাটা এন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কাস্টমার সাপোর্ট, সেলস/অনলাইন মার্কেটিং, অনলাইন সার্ভে, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ভার্চুয়াল এসিস্ট্যান্স ইত্যাদি।

যারা ইংরেজিতে ভালো দক্ষ ও যেকোনো লেখা লিখতে পারেন তারা ব্লগ/আর্টিকেল রাইটিং করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনো ব্লগের জন্য পোস্ট, রিভিউ রাইটিং করা যাবে। ডাটা এন্ট্রি ক্ষেত্রে রয়েছে পিডিফ থেকে এক্সেল শিট সম্পাদন, ক্যাপচা এন্ট্রি ইত্যাদি। গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে অ্যাডোব ইলাস্ট্রেটর, ফটোশপ ইত্যাদি যেকোনো বিষয় নির্বাচন করতে পারেন। আর কাস্টমার ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইমেইল রেসপন্স, কল রেসপন্স বা কল সেন্টার সার্ভিস দেয়া যাবে। জনপ্রিয় আরেকটি বিষয় সেলস মার্কেটিং ক্যাটাগরিতে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন [এসইও], মার্কেট রিসার্চ, সোশ্যাল মার্কেটিং সহ ইত্যাদি।

অনলাইন মার্কেটপ্লেস কি?

প্রথমেই বলেছি, একজন ব্যাক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান তার/তাদের কোন কাজ অপর কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্স করেন। সেক্ষেত্রে বড় বাজেটের কন কাজ অথবা বড় কোন প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব সক্ষমতায় বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সারদের মধ্য থেকে ফ্রিল্যান্সার খুজে তাদের প্রজেক্ট আউটসোর্স করেন। কিন্তু তুলনামূলক ভাবে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পর্যায়ে তাদের সেই সক্ষমতা থাকে না। এই ধারণা থেকেই নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট তৈরী হয়েছে, যেখানে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একপক্ষ (ক্লায়েন্ট) তার কাজ সম্পর্কিত শর্তাবলী ও রিকোয়ারমেন্ট উল্লেখ করে বিভন্ন কাজের জন্য আবেদন আহ্বান করে (অনেকটা টেন্ডার আহবানের মত) এবং বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সাররা সেই আবেদনে বিড করে। পরবর্তীতে ক্লায়েন্ট সেই বিডগুলো থেকে যাচাই-বাছাই, অনেক সময় স্কাইপ/ফোন ইন্টারভিউ নিয়ে ফ্রিল্যান্সদের সাথে কাজ দেন।

অনলাইন এধরণের মার্কেটপ্লেসের সংখ্যা অসংখ্য এবং কিছু কিছু মার্কেটপ্লেস আছে বিশেষায়িত। মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজের সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু তারপরও বিশ্বে প্রতিদিন যতগুলো কাজ আউটসোর্স করা হয় তার সামান্য কিছু অংশই শুধু এরকম মার্কেটপ্লেসগুলোতে পাওয়া যায়। তাহলে এবার চিন্তা করুন আউটসোর্স করা কাজের পরিমাণ কতগুলো !!

ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে কাজ করতে/সফলতা চান? তাহলে যা করতে হবেঃ

ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফলতার মুলমন্ত্র হলো মেধা বা দক্ষতা। থাকতে হবে ধৈর্য্য। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো ইংরেজি না জানা বা কম জানা। গার্টনারের জরিপে দেখা গেছে, দেশের তরুণেরা আউটসোর্সিংয়ে পিছিয়ে থাকার পেছনে ইংরেজি দুর্বলতা দায়ী। ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে ইংরেজি যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটি অনেকে বুঝতে চান না। যেহেতু বিদেশী বায়ারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হয় সে জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। নতুবা কোনভাবেই আপনি আপনার বায়ারের রিকোয়ারমেন্ট যেমন বুঝতে পারবেন না তেমনি কোন সমস্যাও তাকে বুঝিয়ে বলতে পারবেন না। ইংরেজিতে দূর্বলরা উপরের কথা পড়ে হয়ত ভড়কে যেতে পারেন, তবে তাদের জন্য বলতে পারি যে আপনাকে কিন্তু ইংরেজিতে পন্ডিত হতে হবে এমনটি নয়। ভাব বিনিময় এবং ব্যবসায়িক কাজগুলোর জন্য সাধারণত যে ইংরেজি ব্যবহৃত হয় সেটি জানলেই চলবে। যারা ইংরেজিতে দূর্বল তাদের এটি দূর করতে খুব বেশি যে সময় লাগবে এমনটি নয়, ২ থেকে ৩ মাস একটু চেষ্টা করলেই এ ধরণের ইংরেজি রপ্ত করা সম্ভব। এছাড়া প্রয়োজনীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কাজের পাশাপাশি ইন্টারনেট সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। কাজ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ডেডলাইনের দিকে নজর রাখা জরুরী। পারলে ডেডলাইনের আগে ভাগেই কাজটি শেষ করে বায়ারের কাছে জমা দেওয়া ভালো। এছাড়া ভালো রেটিং পাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আর হ্যাঁ, দ্রুত কাজের জন্য অবশ্যই অপেক্ষাকৃত ভালোমানের কম্পিউটার ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট থাকতে হবে। আর কাজের ধরণ অনুযায়ি স্ক্যানার, ডিজিটাল ক্যামেরা বা অন্য কোনো যন্ত্রেরও প্রয়োজন পড়তে পারে।

অনেকেই হয়তো বলে থাকেন “সিক্রেট টিপস”। কিন্তু আমার মতে ফ্রিল্যান্সিং এ সিক্রেট টিপস হচ্ছে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আগ্রহ আর লক্ষ্যে পৌঁছানোর জেদ। ধৈর্য নিয়ে প্রতিটি সিঁড়ি পাড়ি দেওয়া।

দক্ষতা অনুযায়ি কাজ বেছে নেওয়া: 

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সফলতার পিছনে সবচেয়ে জরুরী যা খেয়াল রাখতে হবে তা হলো, নিজের দক্ষতা খুজে বের করে অথবা পছন্দের বিষয় খুজে বের করে সেই বিষয়ে নিজেকে আরও দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে তোলা। পছন্দের বিষয় এই জন্যই বলা, কারণ আপনি যদি কোন কিছু করতে বিরক্তি বোধ করেন তাহলে কোনভাবেই সেখানে বেশিদিন কাজ করতে পারবেন না। এখানেও ঠিক একই ব্যাপারটা ঘটে। এজন্য বিষয়টা পছন্দ করতে হবে হবে এমন যেখানে আপনি নিজেই অনেক আগ্রহী এবং রিসার্চ করেও আপনি ক্লান্ত হবেন না! যত জানবেন তত আরো জানতে ইচ্ছে হবে এমন।
এরপর প্রথমে যে কাজটি কাজ করবেন তা হলো নিজের দক্ষতা বা পছন্দের বিষয় অনুসারে কাজ খুঁজে বের করা। একজন ফ্রিল্যান্সারের প্রথম কাজ হলো তিনি কি করবেন সেটি আগে নির্ধারণ করা। বিষয় নির্ধারণ করে সেক্ষেত্রে নিজেকে যে বিষয়ে আন্তর্জাতিকমানের হিসেবে গড়ে তুলেছেন বা তুলতে পারার মতো মনোবল আছে সেটি প্রাধাণ্য দেয়া উচিত। কারণ তাকে আন্তর্জাতিক মার্কেটে অভিজ্ঞদের সাথে বিড করে কাজ পেতে হবে। অভিজ্ঞ নন, সে বিষয়ে নিয়ে কাজ করতে যাওয়া মানেই বোকামির পরিচয়।

মার্কেটপ্লেস কিভাবে কাজ করে?:

ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে মার্কেটপ্লেস বলতে বোঝায় যেখান থেকে ফ্রিল্যান্স কাজ পাওয়া যায় বা দেয়া যায়। যারা এসব সাইটে কাজ দেয় তাদের বলা হয় ক্লায়েন্ট। আর যারা এই কাজগুলো করেন মানে আমরা হলাম ফ্রিল্যান্সার। ফ্রিল্যান্সার একটি কাজের জন্য বা প্রজেক্টের জন্য বিড বা আবেদন করে। কত দিনের মধ্যে প্রজেক্ট জমা দিতে হবে, কত টাকায় তা সম্পন্ন করতে হবে সব বিষয় পরিস্কার উল্লেখ থাকে। ফ্রিল্যান্সাররা আবেদন করার পর ক্লায়েন্ট যাকে ইচ্ছা তাকে কাজটির জন্য নির্বাচন করতে পারে। ক্লায়েন্ট সাধারণত ফ্রিল্যান্সারের পূর্ব অভিজ্ঞতা, বিড করার সময় ফ্রিল্যান্সারের আবেদন (কাভার লেটার/এপ্লিকেশন) ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। বলে রাখা ভালো, কোন কাজের জন্য যখন একজন ফ্রিল্যান্সার কাভার লেটার/এপ্লিকেশন লিখেন তখন তা স্টেটমেন্ট অফ ইন্টারেস্ট হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেই কাভার লেটার/এপ্লিকেশন উপর ভিত্তি করেই ক্লায়েন্ট অসংখ্য ফ্রিল্যান্সারের মাঝে শর্ট-লিস্টিং করেন।  শর্ট-লিস্টিং করার ক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট ফ্রিল্যান্সার পূর্বে যাদের সাথে কাজ করেছেন তাদের রিভিউ, ফ্রিল্যান্সারের রেটিং এমং বিড এমাউন্টও বিবেচনা করেন।

সব প্রক্রিয়া শেষ করেই ক্লায়েন্ট প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্রিল্যান্সারকে প্রজেক্ট প্রোপোসাল এবং অফার দেন এবং ফ্রিল্যান্সার অফার একসেপ্ট করলে মার্কেটপ্লেসের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হয়ে যায় এবং মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে কাজ করার সুবিধা হলো টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা। যে সাইটির মাধ্যমে কাজটি পাওয়া গেছে সে সাইটটি নির্দিষ্ট কমিশন রেখে বাকি টাকা ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়। মূলত মার্কেটপ্লেস এখানে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে । ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক মার্কেটপ্লেস রয়েছে। এ ধরণের বহুল ব্যবহৃত কিছু মার্কেটপ্লেস হলো- ফ্রিল্যান্সার ডটকম, আপওয়ার্ক (ওডেস্ক/ইল্যান্স), ফাইভার, পিপল পার আওয়ার, গ্রাফিকাইভার, এনভাটো, থিম ফরেস্ট, এসইও ক্লার্ক ইত্যাদি। এসব সাইটে বিনামুল্যে নিবন্ধণ করে শুরু করা যেতে পারে ফ্রিল্যান্সিং কাজ। নিবন্ধনের আগে অবশ্যই সাইটটির বিভিন্ন নিয়মাবলি, কাজ পাবার যোগ্যতা, পেমেন্ট মেথড বা বিভিন্ন চার্জ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে মোটামুটি ধারণা দিতে পেরেছি বলে আশা করছি। এবার আসুন আপনাদের দুটি বিষয় জানাই। একটি আনন্দের এবং আরেকটি দুঃখের !!! দুঃখের সংবাদটি দিয়েই শুরু করছি।

আমার আব্বা একদিন কাজ করার সময় মজার ছলে বললো, “কি করস সারাদিন ল্যাপটপের সামনে? বসে খালি টাইপ করস”। এই ধারণাটা সমাজের প্রায় সবার। বিশেষত মুরুব্বী শ্রেণীর। সত্যি বলতে কি তাদের এখানে কোন দোষ নেই, কারণ তাঁদের যা বুঝানো হয় তাঁরা তাই বলে। এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী আমাদের চটকদার সমাজের প্রতিনিধীরা। আমি বলছি না সবাই, তবে তাঁদের অধিকাংশের ফ্রিল্যাংসিং থুক্কু আউটসোর্সিং বলতে ডাটা এন্ট্রির কাজকে বুঝিয়ে থাকে যা তাঁরা মুরুব্বী শ্রেণীর মানুষকে টাইপিং বলে বুঝায়। অথচ ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে সবচেয়ে পরিশ্রমের কিন্তু খুবই কম আয়ের কাজ হচ্ছে ডাটা এন্ট্রি। এছাড়াও জ্ঞানে, সজ্ঞানে তারা রংচঙে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রশিক্ষণার্থী যোগাড় করে এবং পরবর্তীতে সে দক্ষ হয়ে উঠার আগেই মার্কেটপ্লেসে এক্তা একাউন্ট খুলে দেয় এবং না জেনে সেই প্রশিক্ষণার্থী একের পর এক কাজে বিড করতে থাকে। কখনো কখনো ক্লায়েন্ট পেয়ে যায় যার ফলাফল হয় ভয়াবহ। সে যেহেতু তেমন কিছুই জানে তাই কাজ করে দিতে পারে না এবং পরিণামে সেই প্রশিক্ষণার্থীকে তো ক্লায়েন্ট ব্যাড রিভিউ দেয়ই এবং পরবর্তীতে কোটেশনের মধ্যে লিখে দেয় “DON’T APPLY IF YOU ARE A BANGLADESHI” যা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার এবং সেই প্রশিক্ষণার্থী নিজের অজান্তেই মার্কেটপ্লেস নষ্ট করে দেয়। আর এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী সেই চটকদার বিজ্ঞাপনওয়ালারাই !!!

শেষ করছি কিছু আশার কথা শুনিয়ে। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে ফ্রিল্যান্সেরের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ও আয়ের দিক থেকে তৃতীয়। চিন্তা করুনতো উপরের ব্যাপারগুলো যদি না থাকত তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান আজকে কোথায় হত !!! আরো আশার ব্যাপার হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও প্রধানন্ত্রীর আই সি টি বিষয়ক উপদেষ্টা, ডিজিটাল বাংলাদেশের আর্কিটেক্ট সজীব ওয়াজেদ জয় এর দক্ষ দিকনির্দেশনায় এল ই ডি পি, বেসিস-সেইপ সহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশে দক্ষ ফ্রিল্যান্সার গড়ে তুলছে। তাই সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন ফ্রিল্যান্সিং এ বাংলাদেশের অবস্থান হবে প্রথম। এই স্বপ্ন নিয়েই লিখাটি শেষ করছি।

 

পুনশ্চঃ
এখানের অধিকাংশ ধারণাই আমার নিজস্ব এবং অভিজ্ঞতার আলোকে দেওয়া। তাই ভিন্নমত অথবা সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু চোখে পড়তে পারে। এছাড়াও, আশরাফুল আলম আকাশ ভাই, যিনি পেশায় একজন সাংবাদিক, এই লিখাটি সম্পূর্ণ করার জন্য তার কাছ থেকেও কিছু তথ্য ধার করেছি।

ডিসেম্বর ৪, ২০১৭; ০৩ঃ১৯মিনিট (মধ্যরাত)